নফস

1519 0

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম

একটি বিখ্যাত হাদিসে উল্লেখ আছেঃ
مَنْ عَرَفَ نَفْسَهُ فَقَدْ عَرَفَ رَبَّهُ
 অর্থঃ “যে ব্যক্তি তার নফসকে চিনলো সে তার রবকে চিনলো।”
উপরোক্ত হাদিসটি বিভিন্ন কিতাবে কখনো হযরত রাসূল (সা.)-এর কাছ থেকে আবার কখনো ইমাম আলী সালামুল্লাহি আলাইহির কাছ থেকে বর্ণিত হয়েছেঃ
১। বিহারুল আনওয়ার, খণ্ড ৯৫, পৃঃ নং ৪৫২ (হযরত রাসূল (সা.)-এর কাছ থেকে)
২। গ্বুরারুল হিকাম ওয়া দুরারুল কালাম, পৃঃ নং ২৩২ (ইমাম আলী আলাইহিস সালামের কাছ থেকে)
৩। মিসবাহুশ শারিআ’, পৃঃ নং ১৩ (ইমাম আলী আলাইহিস সালামের কাছ থেকে)
৪। শারহে নাহজুল বালাগ্বা লি ইবনে আবিল হাদিদ, খণ্ড ২০, পৃঃ নং ২৯২, মিশর প্রিন্ট। (ইমাম আলী আলাইহিস সালামের কাছ থেকে)
 কাজেই, নফসের পরিচয় ও পবিত্রতা লাভ করা প্রত্যেক “সালেক ইলাল্লাহ” ও সাধকের জন্যে অত্যন্ত জরুরী একটি বিষয়।

আসুন! জেনে নিই নফস-এর অর্থ কী?

নফস শব্দের আভিধানিক অর্থ আত্মা, মন, প্রবৃত্তি, প্রাণী, মানুষ, স্বয়ং ইত্যাদি।
আর আল কোরআনে “আল হাওয়া” শব্দটি নফসের ব্যাখ্যা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, যা নফস থেকেই উৎপত্তি।
 
আল্লাহ বলেনঃ
وَ مَاْ يَنْطِقُ عَنِ الْهَوَي
 “তিনি [=রাসূল] প্রবৃত্তির তাড়নায় কোন কথা বলেন না।”
“আল হাওয়া”-এর শাব্দিক অর্থ হল প্রবৃত্তি, কামনা- বাসনা, ইচ্ছা, প্রেম, প্রিয় বস্তু প্রভৃতি।
নফস ভাল মন্দ সকল কিছুর ধারক। একদিকে এই নফস সকল কু-কর্মের প্রতি আকৃষ্টকারী ও যাবতীয় অপর্কমের ধারক, আবার এই নফস-ই একজন মানুষকে আল্লাহ পাকের অতি প্রিয়ভাজন ব্যক্তিতে পরিণত করে। মানব জীবনের সকল ভাল ও মন্দ কর্মের বহিঃপ্রকাশ এই নফসের কারণেই হয়ে থাকে। এই নফসকে যে পরিশুদ্ধ করলো সে-ই সফলকাম হলো।
আল্লাহ বলেনঃ
قَدْ اَفْلَحَ مَنْ زَكَّهَا
“যে ব্যক্তি তার নফসকে পরিশুদ্ধ করলো সে সফলকাম হলো।”
তাই, নফস সমন্ধে জ্ঞান অর্জন করা খুব জরুরী।
رسولُ اللّه ِصلى الله عليه وآله ـ مُخاطِبا أصحابهُ ـ: قَدِمْتُم خَيرَ مَقْدَمٍ ،و قَدِمْتُم مِنالجِهادِ الأصْغَرِ إلىالجهادِ الأكْبَرِ : مُجاهَدَةِ العَبدِ هَواهُ
“কোন এক যুদ্ধ থেকে ফেরার সময় হযরত রাসূল (সা.) সাহাবাদের উদ্দেশ্য করে বললেন,স্বাগতম। তোমরা ছোট যুদ্ধ থেকে ফিরে বড় যুদ্ধের ময়দানে পা বাড়িয়েছ। নবীজি (সা.) বললেন, “নফস বা কুপ্রবৃত্তির বিরোদ্ধে বান্দার জিহাদ।” (এটা শ্রেষ্ঠ জিহাদ)।” (কানযুল উম্মাল, হাদিস নং ১১২৬০)।
ইসলামের মূল শিক্ষাই হলো নফসের পরিশুদ্ধতা অর্জন করা। এই নফসকেই বলা হয় আত্মা। দেহ মানুষের বাহ্যিক বিষয়। তাই, এর ভুল-ত্রুটি আমাদের দৃষ্টিতে পড়ে এবং দৈহিকভাবে রোগে আক্রান্ত হলে তার চিকিৎসা করে। কিন্তু এই মানুষের দেহ কেবল মাত্র এই দুনিয়ার জীবনের জন্য আর আত্মা মানুষের আখিরাতের জীবনের সাথে সংক্লিষ্ট। আত্মিক চিকিৎসা দৈহিক চিকিৎসার পাশাপাশি অপরিহার্য একট বিষয়।

নফসের পাঁচটি রূপঃ

(১) নফসে আম্মারা (২) নফসে লাও-ওয়ামা (৩) নফসে মুৎমায়িন্না (৪) নফসে মুলহিমা (৫) নফসে রহমানী।

 ১। নফসে আম্মারাঃ

وَمَا أُبَرِّىءُ نَفْسِي إِنَّ النَّفْسَ لَأَمَّارَةٌ بِالسُّوءِ إِلاَّ مَارَحِمَ رَبِّيَ إِنَّ رَبِّي غَفُورٌ رَّحِيمٌ
“ইন্নান নাফছা লা আম্মারাতুম বিস সু, ইল্লা মা রাহিমা রাব্বি। ইন্না রাব্বি গ্বাফুরুর রাহিম।”
(সূরা ইউসুফ, সূরা নং ১২, আয়াত নং ৫৩)।
 
অর্থঃ “ (হযরত ইউসুফ বললো), আমি নিজেকে নির্দোষ মনে করছি না, (কেননা), নফস সব সময় মন্দ কাজের দিকে নির্দেশ দেয়, শুধুমাত্র যা আমার প্রতিপালক রহম করে তা ছাড়া। নিশ্চয় আমার রব মহা ক্ষমাশীল দয়াময়।”
ষড় রিপু নামক কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ, মদ ও মাৎসর্য- নফসে আম্মারার উৎকৃষ্ট উদাহরণ। এই রিপুগুলো সর্বদা মানুষকে অন্যায়ের দিকে ধাবিত করে। আমাদের বড় জিহাদ এই নফসের বিরোদ্ধেই। তাওবা থেকে শুরু করে তাক্বওয়ার সিঁড়ি বেয়ে ধাপে ধাপে বিভিন্ন প্রকার যিকির ও নেক আমলের মাধ্যমে এই পরিশুদ্ধতা অর্জন করা যায়। আর এ পথে যারা সফলতা অর্জন করেছেন তাদের দিক নির্দেশনায় ও গাইডে ঐ সকল ধাপগুলো অতিক্রম করা একান্ত কর্তব্য।

২। নফসে লাও-ওয়ামাঃ

وَلَا أُقْسِمُ بِالنَّفْسِ اللَّوَّامَةِ
“ওয়া লা-উক্বসিমু বিন্নাফ্-সিল্ লাও-ওয়া-মা”
অর্থঃ “আমি কী নফসে লাওয়ামার [=তিরস্কারকারী/ভৎসনাকারী/অনুতাপকারী নফসের শপথ করবো না?”
(সূরা আল ক্বিয়ামা, সূরা নং ৭৫, আয়াত নং ২)
এই নফস কোন পাপ করার পর অনুতাপের অনুভুতি সৃষ্টি করে।

৩। নফসে মুৎমায়িন্নাঃ

يَاأَيَّتُهَا النَّفْسُ الْمُطْمَئِنَّةُ ارْجِعِي إِلَى رَبِّكِ رَاضِيَةً مَّرْضِيَّةً فَاْدْخُلِي فِيعِبَادِي وَ اْدْخُلِي جَنَّتِي
“ইয়া আইয়াতুহান্নাফসুল মুৎমায়িন্নাহ্, ইরজিই’ ইলা রাব্বিকা র-দ্বিয়াতাম্ মারদ্বি-ইয়া, ফাদ্ –খুলি ফি ই’বাদি ওয়াদ্-খুলি জান্নাতী।”
অর্থঃ “(সেদিন আল্লাহর বিশেষ প্রিয়ভাজনদের) বলা হবে, হে প্রশান্ত আত্মা (নফসে মুৎমায়িন্না,)!
তাঁর উপর তোমার সন্তুষ্টি এবং তোমার উপর তাঁর সন্তুষ্ট হওয়া অবস্থায় তুমি তোমার প্রতিপালকের কাছে ফিরে এসো। তুমি আমার (বিশিষ্ট) বান্দাদের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাও, আর তুমি আমার জান্নাতে প্রবেশ করো।”
(সূরা আল ফাজর, সূরা নং ৮৯, আয়াত নং ২৭, ২৮, ২৯, ৩০) ।
নফসে আম্মারাকে নিয়ন্ত্রন ও পরিশুদ্ধতা আর নফসে লাও-ওয়ামার অনুতাপের মাধ্যমে যিকির ও ইবাদতের পরিমান বৃদ্ধি করে ষড় রিপুর বিরোদ্ধে সংগ্রামের সফলতা হচ্ছে নফসে মুৎমায়িন্না।

৪। নফস মুলহিমাঃ

وَنَفْسٍ وَمَا سَوَّاهَا فَأَلْهَمَهَا فُجُورَهَا وَتَقْوَاهَا
“ওয়ান্নাফ্-সিউ ওয়া মা সাও-ওয়াহা। ফা-আলহামাহা ফুজু-রাহা ওয়া তাক্বওয়াহা।”
অর্থঃ “কসম মানুষের আত্মার এবং যিনি তাকে আকৃতিতে সুঠাম করেছেন, অত:পর তিঁনি সেই নফসকে তার মন্দকর্ম ও তার তাক্বওয়ার জ্ঞান দান করেছেন।”
(সূরা আশ শামস, সূরা নং ৯১, আয়াত নং ৭ ও ৮)।
অর্থাৎ যে নফস ইলহাম প্রাপ্ত হয়। এই নফস সেই ইলহামের মাধ্যমেই সত্য মিথ্যা, ভাল মন্দ উপলব্ধি করতে পারে। এই নফস, নফসে মুৎমায়িন্নার আসনে বসে মোরাকেবার হালতে সৎ ও অসৎ এবং সাওয়াব ও পাপের রূপ পর্যবেক্ষন ও অনুধাবন (মুশাহিদা) করতে পারে।

৫। নফসে রহমানীঃ

নফসে মুলহিমার পরবর্তি পর্যায় নফস রহমানী-র অর্জন। নফসে মুলহিমার কাজ পাকাপোক্ত হয়ে গেলে হাসিল হবে নফসে রহমানী।
আল্লাহ বলেনঃ
صِبْغَةَ اللَّهِ وَمَنْ أَحْسَنُ مِنَ اللَّهِ صِبْغَةً وَنَحْنُ لَهُ عَابِدُونَ
“সিবগ্বাতাল্লহি ওয়া মান আহসানু মিনাল্লহি সিবগ্বাতাও ওয়া নাহনু লাহু আ’বিদু-ন।”
অর্থঃ “আল্লাহর রং (ধারন করো) এবং আল্লাহর রঙের চেয়ে উত্তম আর কী রং আছে? (বলো), আমরা শুধু তাঁর [=আল্লাহর] ইবাদত করি।”
(সূরা বাক্বারা, সূরা নং ২, আয়াত নং ১৩৮
হাদিস শরীফে এসেছেঃ
“তাখাল্লাক্কু বি-আখলাক্বিল্লাহ্।”
অর্থঃ “আল্লাহর গুনে গুণান্নীত হও।”
অবশেষে পরিশুদ্ধতার শেষ পরিণতি আল্লাহতে ফানা হয়ে যাওয়া। এই ফানা ফিল্লাহ-র জগতে সকল বহু এক-এ পরিণত হয়ে যায়। একজন আধ্যাত্মিক সাধকের জন্যে সাধনার পথ পরিক্রমায় শেষ ও চুড়ান্ত সন্তুষ্টির মাক্বাম হচ্ছে এই নাফসে রাহমনির ফল।
আমিত্ব থেকে মুক্ত হয়ে নফসের কু-প্রবৃত্তিমূলক কামনা বাসনার পরিপূর্ণ বিরোধীতার মধ্য দিয়ে এগিয়ে এসে পরিশুদ্ধতার শেষ গন্তব্য স্থল হচ্ছে আল্লাহর রঙে রঙ্গিন হয়ে যাওয়া।
আল্লাহ আমাদেরকে তাঁর খালেস বান্দা হিসেবে কবুল করুক।
ওয়া মা তাওফিক্বি ইল্লা বিল্লাহ।

আত্মশুদ্বির উপায়সমূহঃ

প্রথমতঃ আমিত্ব থেকে মুক্ত হওয়ার জন্যে নফসের কু-প্রবৃত্তিমূলক কামনা বাসনার পরিপূর্ণ বিরোধীতা করা একান্ত কর্তব্য।

নফসকে কয়েকটি প্রক্রিয়ায় পরিশুদ্ধ করা যায়ঃ

১. তাওবাঃ

তাওবার অর্থ হল অনুতপ্ত হওয়া, লজ্জিত হওয়া, প্রত্যাবর্তন করা ইত্যাদি। অর্থাৎ আল্লাহর কাছে অপরাধ স্বীকারের মধ্য দিয়ে বিনয়ের সাথে ক্ষমা প্রার্থনা করার নাম হল তওবা। নফসের পরিশুদ্ধির পথে প্রথম কাজটি হলো সকল গুনাহ থেকে তাওবা করে সৎ পথে টিকে থাকার সংকল্প ঘোষণা করা।

২. তাকওয়া অবলম্বনঃ

তাকওয়া শব্দের অর্থ হল আল্লাহকে ভয় করা, সাবধান থাকা, সতর্ক থাকা, বিরত থাকা ইত্যাদি। শরীয়তের পরিভাষায় আল্লাহ পাকের ভয়ে যাবতীয় পাপকার্য থেকে বিরত থাকার নাম হল তাকওয়া। তাওবার ফলাফল ধরে রাখার পথ হচ্ছে এই তাকওয়া। সালেক ইলাল্লাহ এভাবে নফসকে পরিশুদ্ধ করণে এগিয়ে যায়।

৩. যিকির ও কুরআন তিলাওয়াতঃ

যিকিরের আভিধানিক অর্থ হল স্মরণ করা। শরীয়তের পরিভাষায় আল্লাহ পাকের স্মরণ করাকে যিকির বলা হয়।যিকির বিভিন্ন ধরনের হয়ে থাকে। যে ধরনের যিকির নীরবে হয়ে থাকে তাকে যিকিরে খাফী বলা হয়। আর যে ধরনের যিকির উচ্চ শব্দে উচ্চারিত হয় তা যিকরে জালী।এ দু ধরনের যিকিরের মাধ্যমে বান্দা নিজের আত্মাকে পূত-পবিত্র করতে পারে।বিভিন্ন প্রকার যিকির নিয়ম অনুযায়ী আমল করা। আর এই জন্যে কোন মুরশিদের শরনাপন্ন হতে হবে।
আর কুরআন তিলওয়াত হল নফল ইবাদতের মধ্যে শ্রেষ্ঠ ইবাদত।রাসূল(সাঃ) বলেন, “লোহার উপর যেমন মরীচা পড়ে তেমনিভাবে মানুষের অন্তরের উপর মরীচা পড়ে। আর এই মরীচা দূর করার উপায় হল বেশি বেশি করে কুরআন তিলওয়াত এবং মৃত্যুর কথা বেশি বেশি স্মরণ করা।”

৪. শোকর আদায় করাঃ

শোকর শব্দের অর্থ হল কৃতজ্ঞতা। আল্লাহ পাক একজন মানষকে যে হাত, পা। চোখ, নাক, কান, মুখ, বাতাস, রিযিক, পানি দিয়েছেন তার জন্য আল্লাহের কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশের নাম হল সাধারণভাবে শোকর। শোকর আদায়ের মধ্য দিয়ে একজন বান্দা আত্মশুদ্বিতা অর্জন করতে পারে।সালেক ইলাল্লাহ ব্যক্তিকে সর্বদা শোকরের মধ্যে থাকতে হবে।

Related Post

উপদেশ প্রার্থী এক ব্যক্তি

Posted by - August 14, 2019 0
✍️[এক আরব বেদুঈন মদীনা শহরে এসে রাসূলে আকরাম (সা.)-এর খেদমতে হাজির হয়ে আবেদন করলো, “হে আল্লাহর রাসূল (সাঃ)! আমাকে কিছু…

দরুদ ও সালাম প্রসঙ্গে আল্লাহর কালাম

Posted by - September 7, 2019 0
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম। لَقَدْ جَاءكُمْ رَسُولٌ مِّنْ أَنفُسِكُمْ عَزِيزٌ عَلَيْهِ مَا عَنِتُّمْ حَرِيصٌ عَلَيْكُم بِالْمُؤْمِنِينَ رَؤُوفٌ رَّحِيمٌ আরবি উচ্চারণঃ লাক্বাদ জা-আকুম…

আল্লাহর ইসমে আযম

Posted by - September 17, 2019 0
✍️‎[হযরত বারায়া ইবনে আযিব(রাঃ) বলেন, আমি আমিরুল মুমিনিন আলী ‌‎(সালাওয়াতুল্লাহি আলাইহি)-এর ‎খেদমতে‎ আল্লাহর কসম দিয়ে আরজ করলাম, ‎আমাকে আল্লাহর ইসমে…

ওয়াসিলা ধরার নির্দেশ

Posted by - August 14, 2019 0
✍️আল্লাহ্ আল্ ক্বোরআনে এরশাদ করছেনঃ يَا اَيُّهَا الَّذِيْنَ آمَنُوْا اِتَّقُوْا اللهَ وَ اْبْتَغُوْا اِلَيْهِ اْلْوَسِيْلَةَ وَ جَاهِدُوْا فِيْ سَبيْلِ اللهِ…

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *