পবিত্র কুরআনের পারা কী ৩০ নাকি ৪০ বিভ্রান্তির অবসান

826 0

কুরআন এমন একটি মহা পবিত্র গ্রন্থ যে গ্রন্থের রচনা নিয়ে কোন সন্দেহ নেই এবং যার হিফাজতের দায়িত্ব স্বয়ং মহান আল্লাহ নিয়েছেন। “এটা সে কিতাব যাতে কোন সন্দেহ নেই”- সূরা আল বাক্বারা, আয়াত নং-২।
“নিশ্চয় আমরা কুরআন নাযিল করেছি। আর অবশ্যই তার হিফাজতের দায়িত্ব আমাদেরই”- সূরা আল হিজর, আয়াত নং ৯।
কিন্তু এরপরো কিছু মানুষ অন্য মাযহাবকে দমন করার উদ্দেশ্যে আল কুরআনকে ৪০ পারা বিশিষ্ট বলে অপবাদ দিয়ে থাকে। এটা একটা জঘন্য মিথ্যাচার। এখন প্রশ্ন হলো, যারা পবিত্র কুরআনকে ৪০ পারা বিশিষ্ট বলে বিশ্বাস করে ঐ মানুষদের আমরা কেমন মুসলিম মনে করতে পারি! যারা কুরআনকে সন্দেহের চোখে দেখছে এবং যা কুরআন ও আল্লাহর বিধান পরিপন্থি। পবিত্র কুরআনে, মোট পারা ৩০ এবং আয়াত সংখ্যা ৬২৩৬ (কুফি গণনা মতে) মতান্তরে ৬৬৬৬ টি।

মানুষ যেমন নিজের ভুল ঢাকতে নানা ধরণের ফন্দি-প্রবঞ্চনার আশ্রয় নিয়ে থাকে তেমনি অন্য মাযহাবকে ভুল প্রমাণিত করতে নানা ধরণের মিথ্যাচারের আশ্রয় নিয়েছে কিছু স্বার্থান্বেষী ব্যক্তি। তারা ধর্মকে পুঁজি করে নিজেদেরকে ইসলামী স্কলার দেখাতে চায় এবং তারাই পশ্চিমা নকশার পূর্ণতা দানকারী হিসেবে কাজ করে চলেছে। এ কারণে মুসলমানদের মাঝে অনৈক্য দিন দিন বেড়ে চলেছে। কোন মাযহাবের সমালোচনা করতে হলে আগে ঐ মাযহাব সম্পর্কে ভাল জ্ঞান থাকা প্রয়োজন। আর তা না হলে জুতসই সমালোচনা করে তো কোন কাজ হয় না বরং তা নানা ধরণের মিথ্যাচারে পরিগণিত হয়ে থাকে। আল কুরআনে এসেছে, “যে মিথ্যাবাদী তার উপর আল্লাহর অভিশাপ বর্ষিত হোক”- সূরা আলে ইমরান, আয়াত নং ৬১।
“হে ঈমানদাররা! তোমরা অনেক ধারণা পোষণ হতে বিরত থেকো, কেননা কোন কোন ধারণা পাপ হয়ে থাকে।”- সূরা আল হুজারাত, আয়াত নং ১২।

জাফরি মাযহাব নিয়ে প্রধাণতঃ যে মিথ্যা অভিযোগটি ব্যাপক প্রচার হয়ে থাকে সেটি হল তাদের কুরআন ৪০ পারা বিশিষ্ট এবং যার আয়াত সংখ্যা ১৭০০০।যেটি ভিত্তিহীন এবং নিতান্তই কল্পিত। এ বিষয়ে কোন মুসলিম ভাইয়ের মধ্যে যদি কোন সন্দেহ তৈরী হয়, তাহলে তারা শিয়াদের মসজিদে গিয়ে সরেজমিনে সত্যতা যাচাই করতে পারেন। তখন দেখতে পাবেন আপনাদের মসজিদে যে কুরআন এখানেও সেই একই কুরআন। যেমনটি আমি নিজেই সুন্নি হয়েও বিষয়টির সত্যতা অনুধাবন করার চেষ্টা করেছি। এইভাবে, ভিত্তিহীন প্রচার চালিয়ে কোন মাযহাবকে বিনাশ করা যায় না। কারণ, প্রকৃত সত্য মাযহাব আল্লাহ ও তাঁর আহলে বাইত-ই রক্ষা করে থাকেন। আমি যে বিষয়টি দীর্ঘদিন ধরে অনুভব করে আসছি তা হচ্ছে, জাফরী মাযহাবের একটি বড় গুণ এই যে, তারা আহলে বাইতের আর্দশের উপর রয়েছে এবং মুসলিম ঐক্য কামনা করে থাকে।মুসলিম সম্প্রদায়ের সামগ্রিক কল্যাণ কামনা করতে গিয়ে তারা দিন দিন ক্ষতির সমুক্ষিণ হচ্ছে। জাফরী ফিকাহ নিয়ে এমন বানোয়াট মিথ্যা প্রচারের দরুন আজ বহু সত্যান্বেষী মুসলিম ভাই দিন দিন শিয়া মাযহাবের ছায়াতলে শামিল হচ্ছে। জেনে রাখা উচিত, যেখানে সত্যের আলোকে বাস্তবতা নির্মাণ হয় এবং শরীয়তের পরিপূর্ণতার হাতছানি রয়েছে সেখানে সত্যানুরাগী মুমিনের আগমন ঘটবেই।

নিম্নে জাফরী মাযহাব নিয়ে কিছু সুন্নি চিন্তাবিদের মতামত তুলা ধরা হলঃ
ক. প্রখ্যাত মিশরীয় আলেম মুহাম্মদ গাজ্জালী বলেন, “কিছু মানুষ শিয়াদের উপর মিথ্যা অপবাদ দিয়ে বলে, তারা নাকি বিশ্বাস করে, আল কুরআনের আয়াতে ঘাটতি রয়েছে।তারা বলে শিয়ারা নাকি আলী (আঃ)-কে রাসূল (সা:) থেকে অধিকতর যোগ্য মনে করে এবং বলে, জিব্রাঈল (আঃ) ভুল করে নাকি ওহী রাসূল (সা:)-এর উপর নাযিল করেছে। এটি একটি নিকৃষ্ট মিথ্যা অপবাদ।”
খ. সালিম বেহনাসাবী বলেন, “সুন্নিদের মাঝে যে কুরআন প্রচলিত রয়েছে, শিয়াদের ঘরে ও মসজিদে সেই একই কুরআন রয়েছে।”
গ.আল-আযহার বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামী দর্শনের প্রফেসর আবুল ওফা গানীমা তাফতাযানী বলেন, “পাশ্চাত্য ও প্রাচ্যের ইসলামী চিন্তাবিদরা ইসলামের শুরুতে এবং বর্তমান সময়ে শিয়াদের বিষয়ে ভুল সিদ্ধান্ত দিয়েছেন। যে সিদ্ধান্তগুলোর পিছনে কোন দলিল ও বর্ণনামূলক সাক্ষ্য নেই।সাধারণ মানুষরাও এ ভুল মতগুলোর সত্যতা যাচাই বাছাই না করে একে অপরের নিকট পৌঁছে দিয়েছে এবং তার ভিত্তিতে শিয়াদেরকে ভুল মতে বিশ্বাসী বলে অভিযুক্ত করেছে।শিয়াদের মূল গ্রন্থসমূহ সম্পর্কে তাদের নির্বুদ্ধিতা এর অন্যতম কারণ। এ সকল অভিযোগের ক্ষেত্রে তারা শিয়াদের দুশমনদের গ্রন্থগুলোকে সূত্র হিসেবে ব্যবহার করেছে।”
(ত্রৈমাসিক প্রত্যাশা, বর্ষ ৮, সংখ্যা ৩-৪)।

পরিশেষে, মুসলিম ঐক্যের জন্য এমন কল্পিত প্রচার থেকে দূরে থাকা একজন সত্যিকার মুমিনের ইমানী দায়িত্ব।হয়রত ইমাম খোমেইনী (রহঃ) বলেন, “ইসলামী দেশসমূহে যেসব নাপাক লোকজন শিয়া ও সুন্নীদের মাঝে বিভেদ সৃষ্টি করছে, তারা শিয়াও নয়, সুন্নীও নয়, বরং তারা হল সাম্রাজ্যবাদীদের দালাল, যারা ইসলামী দেশসমূহকে আমাদের থেকে ছিনিয়ে নিতে চায়।”

মিজান রেহমান।

Related Post

বিজয়ের চেতনায়

Posted by - August 29, 2020 0
আজ থেকে হাজার বছর পূর্বের ঘটনা। এক পিতার সম্মুখেই তাঁর যুবক পুত্রকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছিলো। সেখানে পিতা ছিলেন অসহায়।…

কোথায় পেয়েছ সেই প্রেম!

Posted by - September 5, 2019 0
সালাম! হে ক্বামার-এ-বনু হাশিম তোমার বিলাশি প্রেমকে সালাম, কি করে এমন বিলাসী হতে পারলে যে, তোমার প্রেমের প্রতি হিংসা করা…

শোকা‌গ্নির শ্বেতবাস !!

Posted by - September 1, 2019 0
দীর্ঘ পথ প‌রিক্রমা শে‌ষে হঠাৎ ঘ‌রে ডুক‌লেন ! বড়ই ক্লান্ত, শ্রান্ত ,অবসন্ন দেহ ও মন । মর্ম ব্যাথায় কুঁক‌ড়ে থাকা…

অব‌রুদ্ধ ফোরাত !!

Posted by - September 8, 2019 0
৭ মহররম ! দূ‌র্যো‌গের ঘণঘটার ডাক ! প্রকৃ‌তির বিলা‌পের সুর বে‌জে উঠার প্রস্তু‌তি ! ব‌য়ে যাওয়া ফোরা‌তের আর্তনাদ! সে আর্তনাদ…

শোকাবহ ৯ই মহররম

Posted by - September 9, 2019 0
হুসাইন(আ:) কে? (পর্ব-৬) – নূরে আলম মুহাম্মাদী। হুসাইন(আ:) কে? তা কি জানো? তাহলে বলি শোন। হুসাইন!!! শুনেছি ইউসুফ নবীর সৌন্দর্যের…

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *