৬৪ হিজরির ১৪ই রবিউল আউয়াল জালিম ও খোদাদ্রোহী শাসক ইয়াযিদ ইবনে মুয়াবিয়া মারা যায়। (আল্লাহর অনন্ত অভিশাপ তার ওপর বর্ষিত হোক) ইয়াযিদ তার তিন বছর নয় মাসের অবৈধ শাসনামলে অন্তত: তিনটি মহাপাপ ও অপরাধযজ্ঞের জন্য ইসলামের ইতিহাসে সবচেয়ে কুখ্যাত ও ঘৃণিত ব্যক্তিতে পরিণত হয়েছে। এই তিনটি মহাপাপের মধ্যে প্রথমটি হল ৬১ হিজরিতে কারবালায় বিশ্বনবী (সা.)-এর প্রিয় নাতি হযরত ইমাম হুসাইন (আ:) ও তাঁর ছয় মাসের শিশুপুত্র হযরত আলী আসগরসহ নবী (দরুদ) বংশের ১৮ জন সদস্যকে নৃশংসভাবে পিপাসার্ত অবস্থায় শহীদ করা। কারবালায় ইমামের আরো প্রায় ৬০ জন সমর্থকও বীরের মত লড়াই করে শহীদ হয়েছিলেন।
ইমাম শিবিরের জন্যে কয়েকদিন ধরে পানি সরবরাহ নিষিদ্ধকারী ইয়াযিদ বাহিনী ইমাম হুসাইন (আ:)-এর পবিত্র লাশসহ নবী-পরিবারের সদস্যদের লাশের ওপর ঘোড়া ছুটিয়ে লাশগুলো দলিত-মথিত করেছিল এবং তাঁদের মস্তক ছিন্ন করে বর্শার আগায় বিদ্ধ করেছিল। তারা কারবালায় ইমাম শিবিরের তাঁবুগুলোতে আগুন ধরিয়ে দিয়ে লুটপাট চালিয়েছিল। এ ছাড়াও নবী-বংশের নারী ও শিশুদেরকেও টেনে হিঁচড়ে শিকল পড়িয়ে বন্দী অবস্থায় কুফার গভর্নরের দরবারে ও দামেস্কে ইয়াযিদের দরবারে নিয়ে গিয়েছিল খোদাদ্রোহী ইয়াযিদ বাহিনী।
ইয়াযিদের দ্বিতীয় মহাপাপটি ছিল পবিত্র মদীনা শহরে হামলা এবং মসজিদে নববীর অবমাননা ও তিন দিন ধরে ইয়াযিদ বাহিনীর হাতে মদীনায় লুট-পাট আর গণহত্যা চালানোসহ গণ-ধর্ষণের অনুমতি দেয়া।
ইয়াযিদের তৃতীয় মহাপাপটি ছিল পবিত্র মক্কার কাবা ঘরে হামলা চালিয়ে তা ধ্বংস করে দেয়া। পাষণ্ড ইয়াযিদের বর্বর সেনারা (কারবালার মহাঅপরাধযজ্ঞ সম্পাদনের তিন বছর পর) পবিত্র মক্কা অবরোধ করে। তারা মহান আল্লাহর ঘরে তথা জ্বলন্ত ন্যাপথালিনযুক্ত অগ্নি-গোলা নিক্ষেপ করে পবিত্র কাবা ঘর জ্বালিয়ে দেয়। ফলে মক্কার বিশিষ্ট সাহাবীদের কাছে ইয়াযিদের খোদাদ্রোহী চরিত্রের বিষয়টি আবারও স্পষ্ট হয়। পবিত্র কাবাঘরে হামলার পর পরই খবর আসে, কুখ্যাত জালিম ও কাফির ইয়াযিদ মারা গেছে।
কথিত আছে যে, কারবালার ঘটনার পর নরাধম ইয়াযিদ তীব্র মাথা-ব্যথা রোগে আক্রান্ত হয়েছিল। একদিন সে মাতাল অবস্থায় শৌচাগারে পড়ে যায় এবং সেখানেই প্রাণ ত্যাগ করে। এ সময় তার বয়স হয়েছিল ৩৭ বছর এবং তার পুরো শরীর আলকাতরার মত কালো হয়ে গিয়েছিল।
অবশ্য মহাপাপী ও অভিশপ্ত ইয়াযিদের মৃত্যু সম্পর্কে কয়েকটি বর্ণনা রয়েছে। কয়েকটি বর্ণনায় (সামান্য পার্থক্যসহ) এসেছে, ইয়াযিদ ৬৪ হিজরিতে একবার তার বেশ কিছু লোকজন নিয়ে পশু শিকারের জন্য রাজধানীর বাইরে যায়। কয়েক দিনের পথ অতিক্রমের পর এক জায়গায় একটি অতি সুন্দর হরিন দেখতে পায়। এ অবস্থায় ইয়াযিদ একাই ঐ হরিন ধরবে বলে ঘোষণা করে এবং এ কাজে কারো সহযোগীতার দরকার নেই ও কেউ যেন তার সঙ্গে না আসে বলেও সে অন্যদের নির্দেশ দেয়। কিন্তু হরিনটিকে শিকার করতে গিয়ে ইয়াযিদ উপত্যকা থেকে উপত্যকা পর্যন্ত ঘোড়া ছুটিয়েও সফল হয়নি এবং এক পর্যায়ে হরিনটি বহু দূরের এক উপত্যকায় অদৃশ্য হয়ে গেলে ইয়াযিদ নিজেকে হারিয়ে ফেলে। ইয়াযিদের লোকজনও আরো আগে থেকে তাকে হারিয়ে খোজাখোজি করছিল। পাষণ্ড ইয়াযিদ এক ভয়াবহ প্রান্তরে তীব্র পিপাসার্ত অবস্থায় পানি খুঁজতে থাকে। কিন্তু কোথাও সে পানি খুঁজে পায়নি। এক পর্যায়ে সে পানির পাত্র হাতে এক আরব ব্যক্তিকে দেখতে পায়। সে তাকে পানি দেয়ার অনুরোধ জানায় এবং বলে যে, আমাকে চিনতে পারলে পানি দেয়া ছাড়াও তুমি অনেক সম্মানও করবে।
ঐ আরব ব্যক্তি বলেন: কে আপনি?
ইয়াযিদ বলে: আমি আমিরুল মু’মিনিন ইয়াযিদ ইবনে মুয়াবিয়া। এ কথা শুনে ঐ আরব ব্যক্তি মহাক্ষিপ্ত হয়ে বলে: আল্লাহর শপথ! তুই হচ্ছিস ইমাম হুসাইন ইবনে আলী (আ:)-র হত্যাকারী, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের (সা.) শত্রু! আর এ কথা বলেই সে তরবারি বের করে ইয়াযিদকে হত্যা করতে এগিয়ে আসে। এ অবস্থায় ইয়াযিদের ঘোড়া মারাত্মভাবে ভীত হয়ে পালাতে চাইলে ইয়াযিদ ঘোড়ার পিঠ থেকে উল্টে পড়ে এবং তার একটি পা ঘোড়ার রেকাবে আটকে যায়। এ অবস্থায় ভীত-সন্ত্রস্ত ঘোড়াটি ইয়াযিদকে নিয়ে কাঁটাযুক্ত বন ও এবড়ো থেবড়ো পাথরের ওপর দিয়ে পালাতে থাকায় তার দেহ থেতলে টুকরো টুকরো হয়ে যায়। (অন্য বর্ণনা অনুযায়ী নিজ ঘোড়ার পায়ের তলেই পিষ্ট হয়ে টুকরো টুকরো হয়ে যায় ইয়াযিদ।) ওদিকে ইয়াযিদের বিশেষ প্রহরীদের একটি দল তাকে খুজতে এসে দেখে যে, ইয়াযিদের শরীর বলতে আর কিছু নেই কেবল তার একটি রান বা পায়ের অংশ বিশেষ ঘোড়ার রেকাবের মধ্যে আটকে ঝুলে আছে। (কিতাবের নামঃ লুহুফ, লেখকঃ সাইয়্যেদ ইবনে তাউস)
হযরত শেইখ সাদুক্ব (রঃ)-এর বর্ণনা অনুযায়ী ইয়াযিদ এক রাতে মাতাল অবস্থায় ঘুমিয়ে পড়ে। সকালে তাকে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়। তার শরীর এতটা কালো হয়ে গিয়েছিল যে, মনে হয় যেন আলকাতরা মাখানো হয়েছিল এই পাষণ্ডের গায়ে। তাকে দামেস্কের বাব আস সাগিরে দাফন করা হয়।
“আল কামিল ফিত তারিখ” কিতাবে ইয়াযিদের মৃত্যু সম্পর্কে এসেছে: “মিনজানিক [=পাথর নিক্ষেপক কামান, যা দিয়ে আল্লাহর পবিত্র ঘর কা’বা ধ্বংস করেছিল] থেকে পাথরের একটি টুকরো ইয়াযিদের মুখের এক পাশে আঘাত করায় সে কিছুকাল অসুস্থ থেকে মারা যায়।”
আবার কোনো কোনো বর্ণনায় এসেছে, বিশ্বনবী (সা.) ও আমিরুল মু’মিনিন হযরত আলী (আ.)-র বিশিষ্ট সাহাবী হুজর বিন উদাই কিন্দির (মুয়াবিয়া তাঁকে নির্মমভাবে হত্যা করে শহীদ করেছিল) কন্যা সালামি হুজর-এর ভাতিজা আব্দুর রহমানের সহায়তায় ইয়াযিদকে বিষ প্রয়োগের মাধ্যমে জাহান্নামে পাঠিয়েছিলেন।
সে যাই হোক, এভাবে ইয়াযিদ তিন বছর সাড়ে নয় মাস দু:শাসন চালানোর পর ৩৭ বছর বয়সে জাহান্নামবাসী হয়।





