নূরনবী হযরত মোস্তফা (সা.) পর্ব-দশ

595 0

নূর নবী মুহাম্মাদ মোস্তফা (সা.)

(১০ম পর্ব)

🌻👉[নবী-রাসূলগণ হলেন বিশ্ব মানবতার জন্যে সর্বোত্তম ঐশী উপহার, তাঁদের নূরের আলোয় মানুষ জীবনের সরু এবং বক্র পথেও সাফল্য ও সুখ সমৃদ্ধির পথ খুঁজে পেতে পারে। আল্লাহর এই দূতদের আবির্ভাবের বৃহৎ লক্ষ্য হলো মানুষকে পূর্ণতায় পৌঁছানো। আল্লাহর সৃষ্টি ব্যবস্থার প্রতি গভীরভাবে মনোযোগী হলে আমরা দেখতে পাই যে, আল্লাহ তাঁর সকল সৃষ্টির মধ্যেই উন্নতির সকল উপাদান ও সাজ-সরঞ্জাম এবং তার পরিপূর্ণতার ব্যবস্থা করেছেন। পরিপূর্ণতার প্রতি আভ্যন্তরীণ প্রেরণার কারণেই প্রত্যেক সৃষ্টবস্তু একটি বিশেষ গন্তব্যের দিকে ধাবমান। ফলে বাধমুক্ত অনুকূল পরিবেশে প্রত্যেক সৃষ্টির সুপ্ত প্রতিভা ও সামর্থের বিকাশ ঘটে থাকে। মাটির নিচে রোপিত দানা অথবা ফলের বীজ বেড়ে ওঠা ও পূর্ণতা লাভের ক্ষেত্রে বিভিন্ন পর্যায় অতিক্রম করে থাকে। সূরায়ে ত্বা-হার পঞ্চাশ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে: “আমাদের প্রতিপালক এমন এক সত্ত্বা, যিনি তাঁর প্রতিটি সৃষ্টিকে তার যোগ্য আকৃতি ও প্রয়োজনীয় সকল উপাদান দিয়ে সৃষ্টি করেছেন। তারপর তিনি পথপ্রদর্শন করেছেন।” এই পরিচালনার বিষয়টি সকল সৃষ্টির ক্ষেত্রেই একটা সাধারণ ব্যাপার। অর্থাৎ একেবারে সূক্ষ্ম অণু থেকে শুরু করে বৃহৎ গ্যালাক্সি পর্যন্ত বিশ্বের প্রতিটি সৃষ্টিই আল্লাহর এই অনুগ্রহ লাভে সমৃদ্ধ। কিন্তু আল্লাহ যাঁকে সৃষ্টির সেরা করে সৃষ্টি করেছেন, সেই মানুষের জন্যে কি প্রাকৃতিক এই পর্যায়গুলো অতিক্রম করাই যথেষ্ট? অবশ্যই না। কারণ মানুষের জীবন বস্তগত জীবনের মধ্যে সীমাবদ্ধ অন্যান্য প্রাণীকূল ও  জড় বস্তর মতো নয়। মানুষের চিন্তাগত ও আধ্যাত্মিক পূর্ণতায় উপনীত হবার জন্যে সঠিক দিক-নির্দেশনা ও সুষ্ঠ পরিকল্পনা খুবই জরুরি। মানুষের প্রবৃত্তি ও প্রবণতা যেহেতু বিচিত্র, তাই আল্লাহ রাব্বুল আলামীনও এমন উত্তম হাতিয়ার ও উপকরণে তাকে সমৃদ্ধ করেছেন, যার সাহায্যে মানুষ সঠিকভাবে তার আভ্যন্তরীণ প্রবৃত্তিগুলোকে শৃঙ্খলাবদ্ধ ও নিয়মানুবর্তী করতে পারে। ফলে আল্লাহ মানুষের পথ প্রদর্শনের জন্যে দুই ধরনের উপকরণ দিয়েছেন। একটি মানুষের আভ্যন্তরীণ সত্ত্বা অর্থাৎ বিবেক-বুদ্ধি, অপরটি হলো আল্লাহর নবী-রাসূল। এ কথা তর্কাতীতভাবে সত্য যে, জ্ঞান-বুদ্ধি অনেক সময় সমস্যা সমাধানের ক্ষেত্রে অক্ষম হয়ে পড়ে কিংবা অনেক সময় আবেগ দ্বারা প্রভাবিত হয়। আবার কখনো কখনো সঠিক চিন্তাশক্তি হারিয়ে স্বার্থান্বেষী হয়ে পড়ে। এ কারণেই এমন ধরনের দিক-নির্দেশনার প্রয়োজন যাতে আল্লাহর সাথে সম্পর্ক সৃষ্টির মাধ্যমে মানুষের বুদ্ধি ও উপলব্ধি ঐশী আলো বা অন্তরদৃষ্টি লাভ করতে পারে এবং ঐ অন্তরদৃষ্টি মানুষকে তার মেধা ও জ্ঞানের সঠিক বিকাশ ঘটাতে সহযোগিতা করতে পারে। চিন্তাবিদ বা গবেষকরা মানুষের অস্তিত্বকে এমন পাহাড়ের সাথে তুলনা করেছেন, যার ভেতরে গুপ্ত রয়েছে মূল্যবান সব পাথর। আর এই পাথরের বিশাল মওজুদ লাভ করতে হলে অর্থাৎ মানুষের ভেতরকার অমূল্য সম্পদ ও সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হলে নবী-রাসূলদের মতো মহাবিজ্ঞ প্রকৌশলীর প্রয়োজন। তাঁরা তাঁদের শিক্ষা ও কর্মকৌশলের সাহায্যে মানুষের আভ্যন্তরীণ ও স্বভাবগত সকল যোগ্যতার বিকাশ ঘটান। হযরত আলী (আ.) *নাহজুল বালাগ্বা*-তে নবীদের আগমণের উদ্দেশ্য সম্পর্কে বলেছেন: “আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আদম সন্তানদের মাঝ থেকেই নবী-রাসূল মনোনীত করেছেন। আর তাদের মধ্য থেকেই ওহীর বার্তা পৌঁছানো ও রেসালাতের দায়িত্ব পালনের শপথ নিয়েছেন….যাতে মানুষের বিবেক-বুদ্ধির সম্ভারে বিদ্যমান মণি-মুক্তাগুলোকে বের করে আনা যায়।”

এমন ধরনের মানুষগুলো নবুয়্যতির দায়িত্ব পালনের জন্যে মনোনীত হয়েছেন, আত্মিক এবং আন্তরিক পবিত্রতার কারণে যাঁদের সাথে ওহীর উৎস তথা আল্লাহর সম্পর্ক ছিল। মানুষের মাঝে আল্লাহর হুকুম-আহকাম প্রচার ও উপস্থাপনার জন্যে তাঁরা ছিলেন সুযোগ্য। নবীগণ সত্যানুসন্ধিৎসা এবং একত্ববাদের ভিত্তির ওপর নির্ভর করে গভীর অন্ধকার সমাজেও মানব স্বভাবকে ঐশী নূরের আলোয় আলোকিত করে তাদেরকে যাবতীয় ভ্রান্ত আকীদা-বিশ্বাস থেকে পবিত্র করেছেন। তাঁরা জাহেলিয়াতের সকল অপচিন্তা ও কুসংস্কারের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেছেন এবং মানবতাকে উন্নত দৃষ্টিভঙ্গি, ন্যায়বাদিতা, স্বাধীনতা বা মুক্তি কামনা এবং একত্ববাদের মতো মহামূল্যবান সম্পদগুলো উপহার দিয়েছেন।

সকল নবীরই অভিন্ন লক্ষ্য ছিল জুলুমের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে সমাজে ন্যায়-নীতি প্রতিষ্ঠা করা। এ ব্যাপারে পবিত্র কোরআনের বহু আয়াতে ইঙ্গিত করা হয়েছে। নবী-রাসূলগণ মানুষকে পূজা-অর্চনা, কু-সংস্কার এবং শের্ক বা অংশীবাদিত্বের জিঞ্জির থেকে মুক্তি দেওয়ার চেষ্টায় লিপ্ত ছিলেন। মানুষের হাতে-পায়ে বাঁধা এইসব জিঞ্জির তাদের চলাফেরার শক্তি-সামর্থ কেড়ে নেয়। এইসব জিঞ্জির কখনো বাহ্যিক আবার কখনো পরোক্ষ। পবিত্র কোরআনের সূরা আ’রাফের ১৫৭ নম্বর আয়াতের একাংশে এই বাস্তবতার প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে।

ইসলামের নবী আল্লাহর সর্বশেষ দূত হিসেবে পৃথিবীতে এসেছেন। তিনি মানুষের মাঝে বিদ্যমান বন্দীত্বের জিঞ্জিরগুলো ছিঁড়ে ফেলার জন্যেই আবির্ভূত হয়েছেন। গর্ব-অহংকার, লোভ-লালসার মতো কু-প্রবৃত্তিগুলো মানুষের আভ্যন্তরীণ জিঞ্জির। এগুলো মানুষের পরিপূর্ণতার পথে সবচেয়ে বড় অন্তরায়। এসব ছাড়াও সমাজের ওপর ছায়া বিস্তারকারী অমানবিক কিছু কিছু বাজে প্রথা বা রীতি-নীতি রয়েছে, যেগুলো মানুষের আধ্যাত্মিক পরিপূর্ণতার পথকে রুদ্ধ করে দেয়। নূরনবী মোস্তফা (সা.) তাঁর সুস্পষ্ট শিক্ষা এবং তৌহিদ বা একত্ববাদী চিন্তার প্রচার-প্রসারের মাধ্যমে মানবতার জন্যে যে শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেছেন তা ছিল যথেষ্ট উন্নত পর্যায়ের। ফ্রান্সের বিখ্যাত গবেষক ডার্মিংহাম বলেন: “শিক্ষণ-প্রশিক্ষণ এবং সংস্কারের সর্ববৃহৎ নীতিমালা বলতে তা-ই ছিল, যা ওহী নামে পর্বে পর্বে নবী মুহাম্মাদের (সা.) উপর অবতীর্ণ হয় এবং মানুষ যাকে আজ কোরআন নামে চেনে।”

নবী-রাসূলগণ মানবতার জন্যে সবচেয়ে বড় যে অবদানটি রেখেছেন, তাহলো তাঁরা আল্লাহ এবং মানুষের মাঝে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক সৃষ্টি করে দিয়েছেন। নবীগণ আল্লাহর বাণীকে যথাযথভাবে মানুষের কাছে পৌঁছিয়েছেন এবং আল্লাহকে কীভাবে ডাকতে হবে তা মানুষকে শিখিয়েছেন। নবীগণ মানুষকে যে শিক্ষা দিয়েছেন, তার ফলে মানুষ নিজের ভেতরে সঠিক পথ খুঁজে বের করার শক্তি-সামর্থ অর্জন করেছে এবং সেই সাথে পৃথিবীতে কীভাবে সুখ-সমৃদ্ধিপূর্ণ জীবনযাপন করা যায়, সেই নির্দেশনাও পেয়েছে। ধর্মের বৈশিষ্ট্যই হলো মানুষকে আল্লাহর পথে ডাকা, আল্লাহর সাথে মানুষের সম্পর্ক সৃষ্টি করে দেওয়া এবং মানুষের অন্তরাত্মাকে ঐশী বাস্তবতা মেনে নেওয়ার জন্যে প্রস্তত করা। নবীগণ জীবনের রাজপথকে উজ্জ্বল আলোয় আলোকিত করে পথের দিশা দিয়ে দেন, আর মানুষ নবীদের দেখিয়ে দেওয়া ঐ পথে জীবনের জটিল অলি-গলিগুলোও পেরিয়ে যায় সহজেই।

একের পর এক নবীদের আগমন এবং শরীয়তের পুনঃ পুনঃ পরিবর্তনের পেছনে কারণ হলো যুগে যুগে মানুষের চাওয়া-পাওয়ার পরিবর্তন। মানুষের জীবন সমস্যা, মানুষের প্রয়োজনীয়তা যুগে যুগে পরিবর্তিত হয়েছে, সেইসাথে সঙ্গতি রেখে ঐশী বিধান দেওয়া হয়েছে। তবে মানুষকে দাওয়াত করার ক্ষেত্রে নবীগণ যে মূলনীতি অনুসরণ করেছেন, তা ছিল অভিন্ন। সকল নবীই মানুষকে একই লক্ষ্যের দিকে আহ্বান জানিয়েছেন। আত্মপরিপূর্ণতা প্রাপ্তির পথে মানুষ সেই কাফেলার মতো, যে কাফেলা একটা নির্দিষ্ট গন্তব্যে যাবার উদ্দেশ্যে যাত্রা করে মারাত্মক চড়াই-উৎরাইয়ের মাঝে এসে পড়েছে, অপরদিকে গন্তব্যে যাবার পথও জানা নেই। ফলে কিছুক্ষণ পর পর একেকজনকে যাবার পথ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে, আর তাদের প্রদর্শিত পথে মাইলের পর মাইল চলার পর এমন জায়গায় গিয়ে পৌঁছে, যেখান থেকে নতুন করে আবার পথের ঠিকানা নিতে হয়। এভাবে পথ চলতে চলতে শেষ পর্যন্ত এমন এক ব্যক্তির সন্ধান পায় যিনি পথের পরিপূর্ণ মানচিত্র নিখুঁতভাবে এঁকে দেন। সর্বদা এবং সকল স্থানের জন্যে প্রযোজ্য ঐ মানচিত্র অনুযায়ী কাফেলা নিশ্চিন্তে তার গন্তব্যে পৌঁছে যায়। হযরত মুহাম্মাদ (সা.) হলেন আল্লাহ প্রেরিত সর্বশেষ রাসূল যিনি মানুষকে তার জীবনের সুখ-সমৃদ্ধি আর স্বাধীনতার পরিপূর্ণ দিক-নির্দেশনা উপহার দিয়েছেন। তিনি হেদায়েতের সর্বোচ্চ চূড়ায় অবস্থান করছেন। তাঁর শিক্ষা চিরন্তন।]

Related Post

পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) মুসলিম বিশ্বের ধর্মীয় ও সংস্কৃতিক ঐতিহ্য

Posted by - October 3, 2022 0
মাহে রবিউল আওয়াল প্রত্যেক মুমিনের কাছে অত্যন্ত প্রিয় একটি মাস। কারণ, এ মাসে ধরাধামে আগমন করেছেন আমাদের প্রাণের চেয়ে প্রিয়…

নূরনবী হযরত মোস্তফা (সা.) পর্ব-পনের

Posted by - November 19, 2020 0
নূরনবী মোস্তফা (সা.) [ইসলামের ইতিহাস সম্পর্কে আপনারা যারা খোঁজ-খবর রাখেন তারা নিশ্চয়ই জানেন যে, সপ্তম হিজরীতে কুরাইশ প্রতিনিধিবৃন্দ এবং রাসূলে…

নূরনবী হযরত মোস্তফা (সা.) পর্ব-বার

Posted by - November 16, 2020 0
নূরনবী মোস্তফা (সা.) ✍[রাসূল (সা.) একদিন মসজিদে গিয়ে আধ্যাত্মিকতাপূর্ণ একটা পরিবেশ অনুভব করলেন ৷ তাঁর অনুসন্ধানী দৃষ্টি মসজিদের প্রতি নিবদ্ধ…

নূরনবী হযরত মোস্তফা (সা.) পর্ব-চৌদ্দ

Posted by - November 18, 2020 0
নূরনবী মোস্তফা (সা.) ✍[“ইমাম আলী (সালামুল্লাহি আলাইহি) বলেছেনঃ “মুহাম্মাদ আল্লাহর মনোনীত নবী এবং রহমতের রাসূল।….বস্তুতঃ রাসূল আকরাম (সা.) কে নেতা…

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *